বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বার্ষিক এই মানবসমাবেশকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করতে ব্যাপক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে আরাফাত থেকে মুজদালিফায় রাতারাতি স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।
ধবধবে সাদা কাপড়ের ইহরাম পরা লাখ লাখ হাজি আরাফাত থেকে মুজদালিফা হয়ে মিনা পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ হাঁটার পথ দিয়ে এগিয়ে যান। সৌদি আরব কর্তৃপক্ষের মতে, নিয়মিতভাবে এত বড় গণজমায়েতের জন্য ব্যবহৃত পথ হিসেবে এটি বিশ্বের দীর্ঘতম হাঁটার পথ।
পবিত্র স্থানগুলোর মধ্য দিয়ে হাজিরা যখন হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন মরুভূমির তীব্র গরম কমাতে এই পথের বিভিন্ন অংশে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
মুজদালিফায় হাজিরা রাতভর ইবাদত-বন্দেগি ও পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন। এরপর হজের তৃতীয় দিন—যা ‘ইয়াওমুন্নাহর’ বা কোরবানির দিন নামে পরিচিত—ভোরে প্রথম পাথর ছোড়ার জন্য তাঁরা মিনায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন।
একজন হাজি প্রতীকী শয়তানের পিলারে পাথর মারছেন। ২৭ মে ২০২৬, মিনাছবি: রয়টার্স
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তাকর্মী, চিকিৎসা দল এবং সেবাকর্মীরা পরিবহন, জরুরি সেবা, পরিচ্ছন্নতা ও মাঠপর্যায়ের দিকনির্দেশনার কাজগুলো একসঙ্গে সমন্বয় করায় হাজিদের যাতায়াত ও ভিড় ব্যবস্থাপনা বেশ সুশৃঙ্খল ছিল।
হজের এই তৃতীয় দিনটি ইসলামের অন্যতম প্রধান উৎসব ঈদুল আজহার প্রথম দিনের সঙ্গে মিলে যায়। আল্লাহর আদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে নবী ইব্রাহিম (আ.)–এর নিজের সন্তানকে কোরবানি দেওয়ার ইচ্ছার স্মৃতিতেই এই উৎসব উদ্যাপিত হয়।

প্রথম বড় শয়তানকে পাথর ছোড়ার পর আজ হাজিরা পশু কোরবানি দিচ্ছেন এবং মাথা ন্যাড়া বা চুল ছোট করছেন। এরপর ইহরামের পবিত্র অবস্থা থেকে আংশিক মুক্তি নেবেন। এরপর অনেকেই মক্কার মসজিদুল হারামে (কাবা শরিফ) গিয়ে ‘তাওয়াফ আল-ইফাদাহ’ (কাবা শরিফ সাতবার প্রদক্ষিণ করা) এবং সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে ‘সাঈ’ বা ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দৌড়াবেন।
হাজিরা পরবর্তী সময়ে তাশরিকের দিনগুলোতে আরও পাথর মারতে আবার মিনায় ফিরে আসবেন।
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার হাজিরা হজের মূল স্তম্ভ ‘আরাফাতের ময়দানে’ সমবেত হন। সেখানে তাঁরা ইবাদত–বন্দেগি করেন এবং নামিরাহ মসজিদে হজের খুতবা শোনেন। এরপর সূর্যাস্তের পর তাঁরা মুজদালিফায় যান।
মক্কার পবিত্র কাবা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত আরাফাত ময়দান ইসলামি ঐতিহ্যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি আদম ও হাওয়া (আ.)-এর পুনর্মিলনের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। এই ময়দানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘জাবালে রহমত’ বা রহমতের পাহাড়, যেখানে হাজিরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দোয়া ও আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকেন।
সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের হজে ১৭ লাখ ৭ হাজার ৩০১ জন হাজি অংশ নিয়েছেন, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ২ দশমিক ০৪ শতাংশ বেশি।
এঁদের মধ্যে ১৫ লাখ ৪৬ হাজার ৬৫৫ জন সৌদি আরবের বাইরে থেকে এসেছেন এবং ১ লাখ ৬০ হাজার ৬৪৬ জন স্থানীয় হাজি ও বাসিন্দা। আন্তর্জাতিক হাজিদের বেশির ভাগই আকাশপথে ভ্রমণ করেছেন।
সৌদি কর্মকর্তারা এই হাজি বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উন্নত সেবাব্যবস্থা, হজের ডিজিটাল পদ্ধতি এবং নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও লজিস্টিক সংস্থাগুলোর মধ্যকার আরও জোরালো সমন্বয়কে কৃতিত্ব দিয়েছেন।
সৌদি আরব তাদের ‘মক্কা রুট ইনিশিয়েটিভ’ কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি করেছে। এ ব্যবস্থার ফলে হাজিরা নিজ দেশ থেকেই অভিবাসন ও কাস্টমসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আসতে পারেন। এ বছর প্রায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার হাজি এই সুবিধা ব্যবহার করেছেন, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই মৌসুমে হজের কার্যক্রম পরিচালনায় ৪ লাখ ৪১ হাজারের বেশি কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। হাজিরা যখন হজের চূড়ান্ত প্রধান ধাপগুলোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তখন এই কর্মীরা ভিড় ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছেন।