ডেইলি টপ আলাপ ডেস্ক ২৫ অগাস্ট ২০২৬ , ১২:৫৮ পিএম প্রিন্ট সংস্করণঃ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা এবং পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যেই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনীরের তেহরান সফর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে কৌতূহল তৈরি করেছে।
সফরের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার টেলিফোনে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানা গেছে। ফলে এই সফরকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে- আসিম মুনীর কি ওয়াশিংটনের কোনো বার্তা নিয়ে তেহরানে গেছেন, নাকি ভেঙে পড়া শান্তি আলোচনাকে পুনরুজ্জীবিত করতেই পাকিস্তান নতুন উদ্যোগ নিয়েছে?
ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ইরানের পাশে দাঁড়ানো দেশ বা পক্ষও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে। এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে আসিম মুনীরের সরাসরি তেহরান সফরকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার পর আসিম মুনীরের এই সফর কেবল পাকিস্তান-ইরান দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বার্তা বা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব নিয়েও তিনি তেহরানে গিয়ে থাকতে পারেন। যদিও প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে, তবু আড়ালে নতুন করে সমঝোতার চেষ্টা চলছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটেই মুনীরের সফরকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানে ব্যস্ত সফরসূচি
একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে গত সোমবার তেহরানে পৌঁছান আসিম মুনীর। সফরে তিনি ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মেজর জেনারেল মহসেন রেজাইয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। বৈঠকে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর গুরুত্বারোপ করে রেজাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তার আচরণ পরিবর্তন করতে হবে এবং সমঝোতা স্মারকের শর্ত বাস্তবায়নে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। আইআরআইবির তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন মহসেন রেজাই।
গালিবাফের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা
এর আগে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গেও বৈঠক করেন আসিম মুনীর। বৈঠকে গালিবাফ পশ্চিম এশিয়ায় শত্রুতা বন্ধ, হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রযুক্তিগত আলোচনার পথ তৈরির লক্ষ্যে গত জুনে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক নিয়ে কথা বলেন। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র বারবার ওই সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। টেলিগ্রামে গালিবাফের শেয়ার করা এক বিবৃতি অনুযায়ী, বৈঠকে সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিষয় পর্যালোচনা করা হয়।
গালিবাফ বলেন, সমঝোতা স্মারকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রই তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করেছে এবং নতুন করে অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করেছে। তিনি আরও বলেন, তেহরান এখনো সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে এবং কোনো বাহ্যিক চাপের মুখে ইরান তার অবস্থান পরিবর্তন করবে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকেই সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে আসিম মুনীরও অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন।
পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক, আরাকচির সঙ্গেও আলোচনা
সফরের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আসিম মুনীর। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গেও তার বৈঠকের কথা রয়েছে। এছাড়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গেও তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে মুনীরের সফরসূচি থেকে স্পষ্ট, তেহরানের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক- তিন স্তরেই পাকিস্তান যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতার ভূমিকা
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সরাসরি মাত্র একবার বৈঠকে বসেছে, আর সেই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামাবাদে। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক প্রণয়নেও পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল। পাকিস্তানের পক্ষে এই সমঝোতা প্রক্রিয়ায় বিশেষ ভূমিকা রেখে আসছেন আসিম মুনীর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কও ভালো বলে মনে করা হয়। সে কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনার মধ্যে তার তেহরান সফরকে বিশ্বরাজনীতির একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত জুনে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর দুই পক্ষের মধ্যে অনাস্থা ও অবিশ্বাসের কারণে শান্তি উদ্যোগ কার্যত ভেস্তে যায়। এরপর আবারও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধংদেহী অবস্থানে ফিরে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে আসিম মুনীরের তেহরান সফরের মূল লক্ষ্য ভেঙে পড়া সেই আলোচনা আবার শুরু করা এবং নতুন কোনো সমঝোতার পথ তৈরি করা- এমনটাই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। তবে তার এই সফর শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর বাস্তব কোনো উদ্যোগে রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের প্রধান নজর।
তথ্য সূত্র- রয়টার্স।











